এসিন (Essene): নীরব সাধনা ও বিশুদ্ধতার সন্ধানে এক ইহুদি সম্প্রদায়
ইহুদি ধর্মের ইতিহাসে “এসিন” (Essene) ছিল এক রহস্যময় ও তপস্বী ধর্মীয় সম্প্রদায়, যারা দ্বিতীয় মন্দির যুগে (খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দী পর্যন্ত) সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কঠোর ধর্মীয় শৃঙ্খলা ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতার সাধনা করত।
যেখানে ফারিসি ও সাদুসিরা সমাজ ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল, এসিনরা বেছে নিয়েছিল একাকী জীবন, নিঃশব্দ অধ্যাত্মচর্চা ও নৈতিক শুদ্ধতার পথ।
উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী দ্বিতীয় খ্রিষ্টপূর্ব শতাব্দীতে “হাসমোনীয় যুগে” (Hasmonean Period) ইহুদি সমাজের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও মন্দির রাজনীতির প্রতি ঘৃণা থেকে এসিনদের উদ্ভব।
তারা মনে করতো, জেরুসালেমের পুরোহিত ও রাজনীতিবিদেরা ধর্মীয় নীতিমালা থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তাই “সত্যিকারের ইসরায়েল” প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পবিত্রতার সাধনা প্রয়োজন।
ইতিহাসবিদ ফ্ল্যাভিয়াস জোসেফাস (Flavius Josephus), ফিলো অফ আলেক্সান্দ্রিয়া (Philo of Alexandria) এবং প্লিনি দ্য এল্ডার (Pliny the Elder)—এই তিনজন প্রাচীন লেখক এসিনদের উল্লেখ করেছেন।
তাদের বিবরণ অনুযায়ী, এসিনরা ছিল একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ ভ্রাতৃত্ব, যারা সমাজ থেকে দূরে বসবাস করত—বিশেষ করে মৃত সাগরের (Dead Sea) আশেপাশের মরুভূমি এলাকায়।
বিশ্বাস ও জীবনধারা
এসিনদের জীবনধারা ছিল কঠোর, নিয়মিত ও সামষ্টিক। তারা বিবাহ এড়িয়ে চলতো (যদিও কিছু গোষ্ঠী পরিবারভিত্তিকও ছিল)। ধ্যান, অধ্যয়ন ও শুদ্ধতার আচার পালনে নিবেদিত ছিল।
তাদের মূল বিশ্বাসসমূহ ছিল—
- দৈহিক ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতা: শরীর ও আত্মার বিশুদ্ধতা ঈশ্বরপ্রাপ্তির অন্যতম শর্ত।
- সম্পদের সাম্যবাদী ব্যবহার: ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিষিদ্ধ; সকল সম্পদ ছিল কমিউনিটির মালিকানাধীন।
- ধর্মীয় নিয়মের কঠোরতা: শুদ্ধতা রক্ষায় কঠোর আচার, যেমন নিয়মিত জলস্নান (ritual bath / mikvah)।
- দৈব নিয়তি: তারা বিশ্বাস করতো, পৃথিবীর সকল কিছু ঈশ্বরের নির্ধারিত পরিকল্পনার অংশ।
- দুই রাজ্যের ধারণা: এক রাজ্য হলো “আলো” (সৎ শক্তি), অন্যটি “অন্ধকার” (অসৎ শক্তি)। মানুষ এই দুই শক্তির মধ্যে ক্রমাগত সংগ্রামে লিপ্ত।
কুমরান সম্প্রদায় ও ডেড সি স্ক্রলস
১৯৪৭ সালে জর্ডানের মৃত সাগরের কাছের কুমরান গুহা (Qumran Caves) থেকে যে বিপুলসংখ্যক প্রাচীন হিব্রু পাণ্ডুলিপি উদ্ধার হয়—পরবর্তীতে যেগুলো Dead Sea Scrolls নামে পরিচিত হয়—তা ইতিহাসবিদদের মতে এসিনদেরই রচনা ও সংরক্ষিত দলিল।
এই স্ক্রলগুলোতে পাওয়া যায়—
- তোরাহ্ ও নবীদের বিভিন্ন অনুলিপি,
- গোপন ধর্মীয় নির্দেশাবলি,
- “War Scroll” নামে এক মহাজাগতিক সৎ–অসৎ যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী।
এসিনরা নিজেদের “আলোর সন্তান” (Sons of Light) বলে মনে করতো। তারা মনে করতো, একদিন ঈশ্বরের সহায়তায় “অন্ধকারের সন্তানদের” বিরুদ্ধে জয়ী হবে।
সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন
এসিনরা বসবাস করতো ছোট ছোট কমিউনিটিতে, যেখানে—
- সকলে একই পোশাক পরতো,
- প্রতিদিন ধ্যান ও পবিত্র ভোজ অনুষ্ঠিত হতো,
- প্রতিটি সদস্যকে নৈতিক পরীক্ষার পরই গ্রহণ করা হতো (প্রবেশ প্রক্রিয়া প্রায় তিন বছর দীর্ঘ ছিল)।
তারা জেরুসালেমের মন্দিরে বলিদান দিতো না, কারণ তারা বিশ্বাস করতো মন্দির “অপবিত্র” হয়ে গেছে। ফলে এসিনরা এক প্রকার “ধর্মীয় বিকল্প সমাজ” তৈরি করেছিলো, যেখানে ঈশ্বরের শুদ্ধ রাজত্বের অনুশীলন চলতো।
খ্রিষ্টধর্মে সম্ভাব্য প্রভাব
অনেক গবেষক মনে করেন, এসিনদের নৈতিকতা, পবিত্রতার দর্শন ও সামষ্টিক জীবনধারা প্রাথমিক খ্রিষ্টান আন্দোলনের ওপর প্রভাব ফেলেছিল।
যেমন—
- যোহন ব্যাপ্টিষ্ট (John the Baptist)-এর তপস্যাজীবন ও মরুভূমিতে অবস্থান এসিনদের ধ্যানধারার সঙ্গে মেলে।
- নতুন নিয়ম (New Testament)-এ পাওয়া কিছু বাক্য, যেমন “আলোর সন্তান” ও “অন্ধকারের সন্তান” ধারণাও এসিন গ্রন্থে পাওয়া যায়।
তবে সরাসরি সম্পর্কের প্রমাণ না থাকলেও, উভয়ের মধ্যে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মিল অনস্বীকার্য।
পতন ও বিলুপ্তি
খ্রিষ্টীয় ৬৬–৭৩ সালে রোমানদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের বিদ্রোহের সময় (Jewish Revolt) এসিনদের কুমরান সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে যায়।
তাদের আশ্রম ও গোপন পাণ্ডুলিপি রোমান সেনারা ধ্বংস করে দেয়; সদস্যদের অনেকেই নিহত বা ছত্রভঙ্গ হয়।
এরপর এসিন সম্প্রদায় ইতিহাস থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়—কিন্তু তাদের চিন্তাধারা ইহুদি ও খ্রিষ্টীয় আধ্যাত্মিক ইতিহাসে অমর হয়ে রয়ে গেছে।
উপসংহার
এসিনরা ইহুদি ধর্মের এক অনন্য শাখা—যারা আচার নয়, বরং আত্মিক পবিত্রতা ও নৈতিক ন্যায়বোধকে ঈশ্বরপ্রাপ্তির মূল উপায় হিসেবে মেনে নিয়েছিলো।
তাদের জীবন ছি্লো নিরব, কঠোর, কিন্তু গভীরভাবে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক।
আজও তারা ইতিহাসে এক রহস্যময় প্রতীক—বিশ্বাস, শৃঙ্খলা ও নৈতিক সাম্যের এক নিঃশব্দ ঘোষণা।








Leave a Reply